কথিত আছে একটি সুস্বাদু আস্ত মাছ খেয়েই মৃত্যু হয়েছিল বিখ্যাত সম্রাট মুহাম্মদ-বিন তুঘলকের। যাকে ইতিহাসে পাগলা রাজা নামেও ডাকা হয়। একবার মুহাম্মদ-বিন তুঘলক গেছেন গুজরাটে বিদ্রোহীদের দমন করতে। এমনকি জলাভূমিতে নৌকোয় চেপে বিদ্রোহিদের দমন করতেও জুড়ি নেই সম্রাটের। এরই মধ্যে এক বিকেলে একটা মাছ লাফিয়ে উঠলো নৌকোর উপর। রুপালি রঙের সুন্দর গড়নের মাছটি দেখেই সম্রাট নির্দেশ এই মাছ কেটে রান্না করে আনার। পারিষদরা সবাই বোঝানোর চেষ্টা করলেন এই মাছ বিষাক্ত কিনা জানা নেই, তাছাড়া রোজার মাস চলছে। এখন এই মাছ সম্রাটের মুখে ছোঁয়ানোই ঠিক নয়। কিন্তু সম্রাট সেই নির্দেশ মানলেন না। তৃপ্তি করেই খেলেন এবং অনেকটাই। এরপরেই সম্রাটের পাতলা পায়খানা শুরু হল। এরই কিছু দিন পরে সম্রাটের মৃত্যু হল। এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা কতটা জানা না গেলেও বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলির লেখায় আমরা এই তথ্য পাই। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের মৎস প্রীতি সবাই জানেন। স্বামী বিবেকানন্দ যেদিন মহাপ্রয়াণে গেলেন সেদিনও দুপুরে নিজের হাতে ইলিশ কিনে এনে খেয়েছিলেন মঠে। সেদিনই প্রথম গঙ্গার ইলিশ উঠেছিল। এমন আরও হাজারো গল্প আছে মাছ নিয়ে। মাছ প্রিয় বাঙালি বাঙালি জাতির সাথে মাছের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কেবল শুধু সুস্বাদুই নয় মাছ, পুষ্টি গুনেও অনন্য। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য মাছ খুব গুরুত্বপূর্ণ। মিষ্টি জলের পুকুর, ডোবা, খালবিল, নদীনালার মাছ যেমন সুস্বাদু তেমনি সমুদ্রের মাছও কিন্তু খুব সুস্বাদু হয়। পাওয়া যায় নানা বৈচিত্রের, নানা স্বাদের মাছ। আর মাছের স্বাদের মধ্যে যেমন হরেক স্বাদ তেমনি বিভিন্ন মাছের পুষ্টি গুনও কিন্তু ভিন্ন হয়। তাই কোনো একটি মাছের সাথে অন্য কোনও মাছের তুলনাই চলেনা। আবার ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট আকারের মাছেদের মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে ‘ছোট মাছ’ বলা হয়। কিন্তু পুষ্টি এবং স্বাদে এই ছোট মাছ বড় মাছের চেয়ে কোনো অংশেই কম ন্য। রুই, কাতলা, মৃগেলের যেমন একটা নিজস্ব স্বাদ রয়েছে তেমনি মৌরলা, পুঁটি, প্রভৃতি মাছের এক এক রকমের স্বাদ। এবং পুষ্টি গুণও আলাদা আলাদা। ছোট মাছ বনাম বড় মাছ মাছের স্বাদ আর গন্ধ আমাদের খাদ্যাভাসের উপর নির্ভর করে। আবার চাষযোগ্য মাছগুলির ক্ষেত্রে বাইরে থেকে দেওয়া মাছের খাবারের গুনমানের উপর তাদের স্বাদ নির্ভর করে। তাই বেশী প্রাকৃতিক খাদ্যে উৎপন্ন মাছের স্বাদ বেশী হয়ে থাকে। যেমন বিদেশে বহুল পরিচিত মাছ হলো সালমন মাছ। জৈব পদ্ধতিতে উৎপন্ন প্রাকৃতিক সালমান মাছের তুলনায় কৃত্রিম খাবারে উৎপন্ন সালমান মাছের স্বাদ কম। তাই বাজারে এই মাছের দামও কম হয়। আবার আমাদের রুই, কাতলার মতো কার্প জাতীয় মাছ ছোট বন্ধ জলাশয়ে হয় সেগুলির তুলনায় বড় জলাশয়ে উৎপন্ন মাছের স্বাদ বেশী হয়। বিভিন্ন মাছের স্বাদে এতো তফাৎ কেন? বিভিন্ন মাছের বিভিন্ন স্বাদ। আসলে আমাদের জিভে চারটি মৌলিক স্বাদ অনুভব হয়। যেমন মিষ্টি, টক, নোনা এবং তেঁতো। মিষ্টি স্বাদ জিভের সামনের অংশে, জিভের অগ্রভাগে এবং প্রান্তে নোনা স্বাদ, জিভের প্রান্তে টক এবং জিভের পেছনে তিক্ততা অনুভব হয়। তেঁতো স্বাদ যেমন অনেক্ষন পরে অনুভূত হয় তেমনি তেঁতো স্বাদ অনেকটা সময় ধরে আমাদের মুখে থেকেও যায়। তাই তেঁতো স্বাদ অনেক্ষন লেগে থাকে বলেই মনে হয়। তবে এই চারটি স্বাদের বাইরেও আরও নানা ধরনের অনুভূতি কোনও কিছুর স্বাদের জন্য ভুমিকা পালন করে। উষ্ণ, ঠাণ্ডা, ব্যাথা, স্পর্শকাতর এবং চাপের সংবেদন অনুভব করে। মুখের মধ্যে খাবার আসার পর বিভিন্ন স্নায়ু ঐ খাদ্যের স্বাদ অনুভবের জন্যে লেগে পড়ে। আর এরপরেই আমরা ধীরে ধীরে সেই খাবারের স্বাদ অনুভব করি। মাছের শরীরে অবস্থিত যৌগগুলির তারতম্যের ফলেই এক একটি মাছের একেক রকম স্বাদ অনুভূত হয়। মৎস্য বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায়, মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া প্রভৃতি জলজ প্রাণীর স্বাদ গন্ধ বিভিন্ন ধরনের স্বাদ যৌগগুলিতে বিভক্ত হয়ে থাকে। যা মাছের প্রজাতি এবং যৌগ গুলির উপর নির্ভর করে। মাছের স্বাদ এবং গন্ধের নিউক্লিয়াসটি সোডিয়াম এবং ক্লোরাইড, আয়ন সহ গ্লুটামিক অ্যাসিড এবং নিউক্লিওটাইডের সিনার্জিস্টিক প্রভাব দ্বারা নির্মিত হয়। মূল স্বাদ বা অন্যান্য স্বাদ সক্রিয় অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রধানত টোরিন এবং আর্জেনিন এবং নিউক্লিওটাইড এবং অজৈব আয়নের প্রভাবের উপর নির্ভর করে। পেপাটাইড, জৈব পদার্থ, জৈব অ্যাসিড এবং শর্করা কিছু মাছের চরিত্রগত স্বাদের জন্য দায়ী। ভলাটাইল, লিপিড, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লাইকোজেন সামগ্রিক গন্ধ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। মাছের পুষ্টিগুণ মাছের স্বাদের সাথে সাথে পুষ্টিগুণেরও তারতম্য রয়েছে। সাধারণত মাছে ফ্যাটের পরিমাণ কম। মাছে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং ওমেগো থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যা শরীরের জন্যে খুব উপকারি। আর মাছের এই ওমেগো থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড চোখ এবং মস্তিস্কের জন্যে খুব দরকারি। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগো থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ক্যানসারের সম্ভাবনা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। তাছাড়া হাঁপানি এবং প্রস্টেট ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত কিংবা সপ্তাহে অবশ্যই মাছ খাওয়া উচিৎ। নিয়মিত অথবা সপ্তাহে একদিন মাছ খেলে কমে যায় স্ট্রোক বা হৃদরোগের সম্ভাবনা। মানুষের একাকীত্ব বা মানসিক কষ্টের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায় নিয়মিত মাছ খেলে। মাছ ব্লাড সুগারের মাত্রাও নিয়ন্ত্রনে রাখে। কয়েকটি ছোট এবং বড় মাছের পুষ্টিগুণের তুলনামূলক চিত্র (প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার যোগ্য অংশে) মাছের প্রজাতি প্রোটিন (গ্রাম) ফ্যাট (গ্রাম) কার্বোহাইড্রেট (গ্রাম) লোহা (গ্রাম) ক্যালসিয়াম (গ্রাম) ফসফরাস (গ্রাম) ভিটামিন (মাইক্রো গ্রাম) ছোট মাছ পুঁটি ১৮.৯ ২.৪ ৩.১ ০.৯৬ ১.০৬ ০.৯৫ ৩৭.০০ মৌরলা ১৫.৮ ৪.১ ১৫.০ ০.০০৭ ১.৭১ - ১৯৬০ মাগুর ১৫.০ ১.০ ৪.২ ০.৭০ ০.১৭২ ০.৩০ - কই ১৪.৮ ৮.৮ ৪.৪ ১.৩৫ ০.৪১ ০.৩৯ ৩২ শিঙি ২২.৮ ৬.৬ ৬.৯ ০.২৬ ০.৬৭ ০.৬৫ - পাবদা ১৯.২ ২.১ ৪.৬ ১.৩ ০.৩২ ০.২১ - ট্যাংরা ১৯.২ ৬.৫ ১.১ ০.৩০ ০.২৭ ০.১৭ - ফ্লুই ১৯.৮ ১.০ - ০.১৬ ০.৫৯ ০.৪৫ - সরপুঁটি ১৫.৬ ৯.৫ - ০.৫৮ ০.২২ ০.১২ - বড় মাছ রুই ১৬.৬ ১.৪ ৪.৪ ০.০০০৯ ০.৬৮ ০.১৫ - কাতলা ১৯.৫ ২.৪ ৩.০ ০.০০০৯ ০.৫৩ ০.২১ - মৃগেল ১৯.৫ ০.৮ ৩.৩ ০.৯ ০.৩৫ ০.২৮ - কালবোস ১৪.১৭ ১.০ - ০.৩৩ ০.৩২ ০.৩৮ - বোয়াল ১৫.৪ ২.৭ - ০.৬২ ০.১৬ ০.৪৯ - চিতল ১৮.৬ ২.৩২ - ২.৯৮ ০.১৮ ০.২৫ - পাংগাস ১৪.২ ১০.৮ - ০.০০০৫ ০.১৮ ০.১৩ - সিল্ভার কার্প ১৬.৩ - - ০.০০০৩ ০.২৬৮ - ১৭ লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ রাজ্য মৎস্য পালন দপ্তর অধিকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।